সাফারি পার্ক ভ্রমণ

মহাশয় থাল থেকে খাবার হাতে নিয়ে গম্ভীর মুখে খুব আগ্রহ ভরে আমাকে দেখছিল, ভাবখানা এমন যেন এখনই বলে বসবে, কি ব্যপার ? বাসায় জানে? :p

এবার চলে গেলাম গাজিপূর সাফারী পার্ক। আসলে প্রথমদিন খুব আয়োজন করে গিয়েছিলাম। কিন্তু পরে গিয়ে দেখি ক্যামেরা তে মেমরি কার্ড ই আনি নাই। এতো মন খারাপ হয়েছিল যে বলার কথা না। তাই দুইদিন পর আবার সুযোগ বুঝে চলে গেলাম।

শীতকাল হলো এই জায়গায় যাওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। সাফারি পার্কে যেতে হলে সারা দিন হাতে নিয়েই যেতে হবে।প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই চোখে পরবে বাগান। পুরো পার্কটি চারটি বলয়ে আবদ্ধ। হাতের বাম দিক দিয়ে গেলে নেচার হিস্ট্রি মিউজিয়াম, এরপর সাফারি আইল্যান্ড, কোর আইল্যান্ড, ফুডকোর্ট, পার্ক অফিস। প্রধান ফটকের ডান দিকেই চোখে পরবে পার্ক এর ম্যাপ আর সোজাসুজি আগালেই কোর আইল্যান্ড এর গেট। প্রথমেই কোর আইল্যান্ড থেকে শুরু করেছিলাম। বাঘ সিংঘ ভাল্লুক চিত্রা হরিণ প্যারা হরিণ জিরাফ জিব্রা বাইসন আরও বিভিন্ন রকম বন্য প্রানীর রাজত্বের মধ্যে বাসে করে ১০ মিনিটের একটা সফর দেয়া হলো। আফ্রিকান সাফারি, সাদা সিংহ সাফারি, টাইগার সাফারি আলাদা আলাদা জোন থাকে। ভাগ্য ভালো থাকলে বাঘের দেখা পাওয়া যেতে পারে। আমার ভাগ্য আসলেই সেদিন ভালো ছিলনা……

 

কোর আইল্যান্ডের সফর শেষে গেট দিয়ে বের হয়ে সাফারি আইল্যান্ডের গেট দিয়ে ঢুকলাম। সাফারি আইল্যান্ডে প্রথমেই ম্যাকাও ল্যান্ড আর প্যারোট অ্যাভিয়ারি। আসাধারণ লাল, নীল, হলদে ম্যাকাও পাখিগুলো দেখলে যে কারো চোখ জুরিয়ে যাবে। ম্যাকাও দেখে আগালেই প্যারোট অ্যাভিয়ারি। হরেক প্রজাতির টিয়া গুলো দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি এদের কিচির মিচিরেও চারিদিক মুখর হয়ে থাকে। প্যারোট অ্যাভিয়ারি থেকে বের হয়ে একটু আগালেই ম্যারিন এ্যাকুরিয়াম। ম্যারিন এ্যাকুরিয়াম দেখে পাড় হলে 9D ভ্যারচুয়াল রিয়ালিটি মুভি থিয়েটার। এইটা এই পার্ক এর অন্যতম আকর্ষণ। ট্রান্সফরমাস, ডাইনোসর থেকে শুরু করে অ্যাডভেঞ্চারাস রোলার কোস্টার, হরর মুভি সহ বিভিন্ন রকম অপসন্স থাকে যেটার মধ্যে থেকে ইচ্ছামত বেছে নেয়া যায়। এরপর বাটারফ্লাই গার্ডেন। বাটারফ্লাই গার্ডেনের মূল আকর্ষণ ফিলিপাইন বাটারফ্লাই। যাদের প্রজাপতির প্রতি আকর্ষণ আছে তাদের এখানে একটু ধৈর্য ধরে থাকতে হবে, মূলত সূর্যের তাপে এরা বেশি বের হয় (দেখার পারফেকট সময় দুপুর ১২টা -৩টা)। ভেতরে বসার জন্য দুই তিনটা বেঞ্চ আছে। চাইলে বসে বসে প্রজাপতির এক ফুল থেকে আরেক ফুলে বিচরণ উপভোগ করা যায়। বাগানের দায়িত্বে যারা আছেন তাদের জিজ্ঞেস করে বিভিন্ন প্রজাপতির নাম, এদের রক্ষণাবেক্ষণ কিভাবে করা হয় তা জানলাম।  বাটারফ্লাই থেকে বের হয়ে একটু আগালেই ফেন্সি কার্প ডক। ছবি তোলার জন্য ভালো জায়গা। হাতে মাছের খাবার দিয়ে দি্ল (হাতে শুটকির গন্ধ হয়ে গিয়েছিল), কোন একটা কার্প মাছকে একটু খাবারের জালে আটকাতেই সব মাছ ছুটে এলো খাবারের লোভে।

 

কার্প ডক থেকে বের হয়ে একদিকে কুমিরের বেস্টনি, সরীসৃপের বেস্টনি,, ময়ুরের বেস্টনি, বিভিন্ন জাতের বক, ঈগল পাখি,পেঁচা, ইমু পাখি, শকুন, বনবিড়াল, বানরের খাঁচা। আরেকদিকে গেলে সাদা কালো রাজহাসের মাঝে মিনি ট্রলারে করে ঘোরার সুযোগ মেলে। বোটে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় বিকেলবেলা। কারণ তখন আবহাওয়া এবং হাঁসের মুড সব মিলিয়ে একটা চমৎকার কম্বিনেশন হয়। বোট থেকে বেরিয়ে বাম দিকে আগালে শিশুপার্ক, ক্রাউন ফিজেন্ট (ময়ুর বেস্টনি) আর হর্নবিল অ্যাভিয়ারি। ক্রাউন ফিজেন্ট এর জায়গাটা খুব বড়, ব্রিজের দুইপাশে মাঝারি আকৃতির গাছ গাছালির মাঝে পাখনা মেলা মুয়ুর বসে আছে দেখতে খুবই ভালো লাগে। এখানে বলে রাখি এই জায়গাগুলোতে যেতে হলে বেশ অনেকদূর হাটতে হবে, শাল গজারির বন থাকলেও রোদের তাপে অনেকেরই কষ্ট হতে পারে। তাই বোট, ক্রাউন ফিজেন্ট বা হর্নবিল যেতে চাইলে প্রখর রোদের তাপের সময়টা( দুপুর ১২টা-৩টা) না যাওয়াই ভালো। আর অবশ্যই সাথে সানগ্লাস/ ছাতা থাকা উচিত।  

 

সাফারি আইল্যান্ডে ফুড কোর্ট আর জায়গায় জায়গায় ছায়াঘেরা বসার ব্যাবস্থা করা হয়েছে। ফুডকর্ট ১ এর পাশেই দুটো হাতি ছেড়ে দেয়া আছে। ইচ্ছা করলেই হাতির পিঠে চড়ে বেরানো যায়,৩০ টাকা করে নিবে।

ঝুলন্ত ব্রিজ, ওয়াচ টাওয়ার আর অর্কিড গার্ডেনে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু এই পোস্টের তারিখ পর্যন্ত সেগুলো বন্ধ ছিল।

 

যাতায়াত, খরচ ও অন্যান্যঃ সাফারি পার্ক যেতে হলে ঢাকার যেকোন জায়গা থেকে প্রথমে গাজিপুর চৌরাস্তা> গাজিপুর বাঘেরবাজার> সাফারি পার্ক এই রুট অনুসরণ করতে হবে। নিজস্ব ট্রান্সপোর্ট না থাকলে মহাখালি বাস স্ট্যান্ড থেকে ময়মনসিংহগামী সিটিং বাসে উঠলে তারা সরাসরি বাঘেরবাজার নামিয়ে দেবে। আলম এশিয়া/ সৌখিন এই বাসগুলো ঐ রুটে যায়। ভাড়া আপনার কাছে ১০০/২০০ টাকা চাইতে পারে কিন্তু দরদাম করে সেটা ৫০/৬০ টাকা করতে হবে (প্রতিজন)। ভুলেও সাফারি পার্ক না বলে বাঘেরবাজার নামবেন বলতে হবে। লোকাল গাড়ি হলে প্রভাতি বনশ্রী ওই রুটে যায়। বাঘের বাজার নেমে ওখান থেকে অটো (১০/২০ টাকা প্রতিজন) অথবা রিক্সা (৪০ টাকা দুইজনের বসার জন্য) করে সরাসরি সাফারি পার্কের সামনে। মতিঝিল থেকে বি আর টিসি বাস যায়। মালিবাগ/রামপুরা বাসীরা সালসাবিল বাসে যেতে পারেন গাজিপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ( প্রতিজন ৪০/৪৫ টাকা)। এরপর সেখান থেকে লেগুনা/অটো তে করে (প্রতিজন ২৫/৩০ টাকা) বাঘেরবাজার, বাঘেরবাজার নেমে অটো/রিক্সা।

বৃহস্পতিবার/ শুক্রবার/ সরকারি ছুটির দিনে পার্কের ভেতরে প্রচন্ড ভিড় হয়। শনিবার হচ্ছে সবচেয়ে ভালো সময়। রাস্তা দেড়-দুই ঘন্টার। পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট নিলে ওয়ার্কিং ডে তে ৩ ঘন্টা লেগে যেতে পারে। আর কোন বন্ধের দিন হলে রাস্তায় ২ ঘন্টার বেশি লাগবেনা। সকাল সাড়ে ৬টায় বের হলে আরামে পৌছানো যাবে। কোনভাবে সকাল ৯টা ক্রস করলে সাফারি পার্ক শান্তিমত ঘুরে বেড়ানো যাবেনা।   

 

সাফারির গেটের বাইরে অনেক বড় পার্কিং এরিয়া, ঠিক বাম পাশেই দেখা যাবে টিকিট কাউন্টার। ভেতরে ঢোকার টিকিট প্রতিজন ৫০ টাকা। ভেতরে ঢুকে কোর আইল্যান্ডে ঢুকলে প্রতিজন ১০০ টাকা। সাফারি আইল্যান্ডে জায়গায় জায়গায় টিকিট কাটার ঝামেলা থাকে বলে পার্ক কর্তৃপক্ষ ১০০ টাকার একটা প্যাকেজ অফার দিচ্ছে যেইটা এই ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকবে। ১০০ টাকায়( ম্যাকাও/প্যারোট/ অ্যাকুরিয়াম/বোটিং/কার্প/হর্নবিল/ ফিজেন্ট) ৭টা প্রধান জায়গা কভার করা যাবে। বাটারফ্লাই দেখতে টিকিট কাটতে হবে প্রতিজন ২০ টাকার। আর ভারচুয়্যাল রিয়ালিটি দেখতে হলে স্টুডেন্ট আইডি কার্ড থাকলে ৫০ টাকা আর এমনিতে ১০০ টাকা(প্রতিজন)। সাফারি তে অবস্থিত অন্য কোন বেস্টুনির কাছে আর কোন টিকিট লাগেনা। নেচার হিস্ট্রি মিউজিয়ামে গেলে ২০ টাকা। শিশুপার্কে প্রবেশ এবং রাইডে চড়ার জন্য আলাদা টিকিট কাটা লাগে (খুব সম্ভবত ১০/২০ টাকা)।

 

সাফারি পার্কে পানি ছাড়া কোন খাবার নেয়ার অনুমতি দেয় না। ভেতরে ও আশেপাশে খাবারের দাম বেশি (সেকেন্ডারী সোর্স)। তাই খেতে চাইলে বাঘেরবাজারে কিছু লোকাল রেস্টুরেন্ট আছে সেখানে খেয়ে নেয়া যাবে। হাল্কা নাস্তা ২০/৩০ টাকায় করা যাবে। ভারি কিছু খেতে গেলে ১০০/১৫০ টাকায় হয়ে যাবে। (প্রতিজন)।

ডিসক্লেইমারঃ জায়গাটা পশুপাখিদের নিজস্ব বসবাস তাই তাদের অযথা বিরক্ত না করে নিজের বিপদ ডেকে না আনাই ভালো। কোর আইল্যান্ডে যেতে হলে অবশই দুপুর ১২ টার আগে পৌছাতে হবে, ১২ টার পর কোর আইল্যান্ড বন্ধ করে দেয়। কোর আইল্যান্ডে আমি যেই বাসে উঠেছিলাম সেই বাসে এসির বদলে ফ্যান দিয়েছিল। জানালা বন্ধ থাকে, অনেক বেশি মানুষ ছিল তাই গরমে সিদ্ধ হয়ে সাফোকেশন শুরু হয়ে গিয়েছিল। তাই বাসে উঠার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে যে বাসে এসি আছে কিনা। পার্কের বিভিন্ন জায়গায় ডাস্টবিন আছে, তাই কোন খাবারের প্যাকেট বা পানির বোতল লেকে বা পার্কে ফেলে জায়গাটার সৌন্দর্য নষ্ট যাতে না হয় সেদিকে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।

যারা সোলো ফিমেল ট্রাফেলার তাদের জন্য বলছি যত আগে পার্কের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়া যায় তত ভালো, ওখানে পুরো জায়গা ঘুরে শেষ করতে ৪ ঘন্টার মত লাগবে, যেহেতু শীতকাল তাই দিনের আলো শেষ হওয়ার আগে বাসে উঠে গেলে ঝামেলা পোহাতে হবেনা। লোকাল জায়গা, অনেক মানুষের আনাগোনা তাই রাস্তায় বা পার্কে সিকিউরিটি ইস্যু নাই, শুধু 9D মুভি দেখার ক্ষেত্রে একটু মানুষজন জমলে তারপর থিয়েটার হলে ঢোকা ভালো।  

অনেক হাটাহাটি এবং রোদে ঘোরাঘুরি করতে হবে তাই সেই অনুযায়ী প্রত্যেককেই কম্ফর্টেবল আউটফিট সিলেক্ট এর ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হবে।

ফটোগ্রাফি টিপসঃ জায়গাটা ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফির জন্য বেস্ট এবং টেলিজুম লেন্স ফরয।সাফারি আইল্যান্ডে প্রতিটা জায়গায় এক্সপোজার চেঞ্জ করতে হবে এই বিষয়টা খেয়াল রাখতে হবে।বোটিং, হর্নবিল আর ক্রাউন ফিজেন্ট এর ছবিতে দিনের আলোর বেশ প্রভাব পরবে ( শীতকাল অনুযায়ী ৯ থেকে ১১ অথবা ৩ থেকে ৪:৩০) তাই সেইভাবে প্ল্যান করতে হবে। বাটারফ্লাই ধরতে হলে ১২ টা থেকে ৩টা উত্তম সময়, সেখানে অনেকটা সময় আর ধৈর্য নিয়ে থাকতে হবে। আর অবশই অবশই বাসা থেকে বের হওয়ার আগে ক্যামেরা (লেন্স/ব্যাটারি/মেমরি কার্ড) চেক করে নিবেন।

 

হ্যাপি ট্রাভেলিং

– অমৃতা (৪/১২/১৬)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s